ফৌজদারি কার্যবিধির (CrPC) ধারা ২৪৭ এবং ২৪৯ এর তুলনামূলক বিশ্লেষণ।

ফৌজদারি কার্যবিধির (CrPC) ধারা ২৪৭ এবং ২৪৯ এর তুলনামূলক বিশ্লেষণ:

ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ২৪৭ এবং ২৪৯, উভয়ই ম্যাজিস্ট্রেটকে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ফৌজদারি মামলার কার্যক্রম বন্ধ করার ক্ষমতা দেয়। যদিও উভয় ধারার উদ্দেশ্য মামলা নিষ্পত্তি করা, তবে এদের প্রয়োগের ক্ষেত্র, শর্তাবলী এবং ফলাফলের মধ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। নিচে এই দুটি ধারার একটি বিস্তারিত তুলনামূলক আলোচনা করা হলো:

১. মামলার ধরন

  • ধারা ২৪৭: এই ধারাটি শুধুমাত্র অভিযোগ মামলার (Complaint Cases) ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এর মানে হলো, যখন কোনো ব্যক্তি সরাসরি ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে অভিযোগ দায়ের করেন এবং সেই অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা শুরু হয়, তখনই এই ধারাটি প্রয়োগ করা যায়।
  • ধারা ২৪৯: এই ধারাটি অভিযোগ ব্যতীত অন্য কোনোভাবে রুজুকৃত মামলার (FIR Cases) ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অর্থাৎ, যে মামলাগুলো পুলিশ তদন্ত করে চার্জশীট জমা দেয়, সেইসব ক্ষেত্রে এই ধারাটি ব্যবহার করা হয়।

২. কার্যক্রম বন্ধ করার ভিত্তি

  • ধারা ২৪৭: এই ধারায় মামলা বন্ধ করার প্রধান কারণ হলো অভিযোগকারীর অনুপস্থিতি (Non-appearance of the complainant)। ম্যাজিস্ট্রেট তখনই আসামিকে খালাস দিতে পারেন যখন অভিযোগকারী নির্দিষ্ট শুনানির তারিখে উপস্থিত হতে ব্যর্থ হন এবং আসামি উপস্থিত থাকেন। এর জন্য কিছু শর্ত কঠোরভাবে পূরণ হতে হয়:
  • আসামির প্রতি হাজিরার জন্য সমন জারি হতে হবে।
  • নির্দিষ্ট তারিখটি শুধুমাত্র একটি আনুষ্ঠানিক তারিখ না হয়ে শুনানির তারিখ হতে হবে।
  • অভিযোগকারীকে সেই শুনানির তারিখে উপস্থিত হতে ব্যর্থ হতে হবে।
  • আসামিকে সেই তারিখে উপস্থিত থাকতে হবে।
  • ধারা ২৪৯: এই ধারার অধীনে, ম্যাজিস্ট্রেট যেকোনো পর্যায়ে কারণ লিপিবদ্ধ করে (recording reasons) কার্যক্রম বন্ধ করতে পারেন। এখানে অভিযোগকারী বা আসামির উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি কোনো বাধ্যতামূলক শর্ত নয়। ম্যাজিস্ট্রেটকে শুধুমাত্র ‘কারণ লিপিবদ্ধ’ করতে হয়, যা তার বিচারিক বিচক্ষণতার ওপর নির্ভর করে। এই ধারায় কোনো খালাস বা সাজার রায় ঘোষণা করা হয় না।

৩. ফলাফলের প্রকৃতি

  • ধারা ২৪৭: এই ধারায় যখন একটি মামলা বন্ধ করা হয়, তখন এর ফলে আসামিকে খালাস (acquittal) দেওয়া হয়। এই খালাস একটি চূড়ান্ত রায়, যা একই ঘটনায় নতুন করে মামলা দায়ের করাকে বারিত করে (ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ৪০৩ অনুযায়ী ‘ডাবল জিওপার্ডি’ নীতি প্রযোজ্য)।
  • ধারা ২৪৯: এই ধারার অধীনে কার্যক্রম বন্ধ করা খালাস বা সাজা কোনটিই নয়। এর ফলে শুধু আসামিকে মুক্তি দেওয়া হয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, একই ঘটনায় নতুন করে মামলা দায়েরের সুযোগ থাকে। কারণ এখানে কোনো চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করা হয় না, তাই ধারা ৪০৩ এর ‘রেস জুডিকাটা’ নীতি এখানে প্রযোজ্য হয় না।

৪. বিচারিক ক্ষমতা ও বিচক্ষণতা

  • ধারা ২৪৭: এই ক্ষেত্রে ম্যাজিস্ট্রেটের কিছু বিচারিক বিচক্ষণতা (discretion) থাকে। যদিও অভিযোগকারীর অনুপস্থিতিতে খালাস দেওয়ার বিধান রয়েছে, ম্যাজিস্ট্রেট চাইলে যুক্তিসঙ্গত কারণে (যেমন, অভিযোগকারীর অসুস্থতার মেডিকেল সার্টিফিকেট) মামলা মুলতবি করতে পারেন। তবে, তাকে সেই মুলতবির কারণ লিপিবদ্ধ করতে হবে। যদি মুলতবির আবেদন অযৌক্তিক হয় বা আসামিকে হয়রানির উদ্দেশ্যে হয়, তাহলে ম্যাজিস্ট্রেট খালাস দিতে পারেন।
  • ধারা ২৪৯: এই ধারায় ম্যাজিস্ট্রেটের ব্যাপক বিচারিক বিচক্ষণতা রয়েছে। তিনি ‘কারণ লিপিবদ্ধ করে’ যেকোনো পর্যায়ে কার্যক্রম বন্ধ করতে পারেন। তবে, এই ক্ষমতা বিচারিকভাবে ব্যবহার করতে হবে এবং উচ্চ আদালতের পর্যালোচনার জন্য কারণগুলো স্পষ্ট ও যুক্তিযুক্ত হতে হবে।

৫. প্রভাব

  • ধারা ২৪৭: এই ধারার অধীনে একবার খালাস হয়ে গেলে, একই অভিযোগের ভিত্তিতে নতুন কোনো মামলা দায়ের করা যায় না। তবে, অভিযোগকারীর মৃত্যু হলে, বিশেষ করে অ-আপোসযোগ্য (non-compoundable) অপরাধের ক্ষেত্রে, আইন একজন যোগ্য ব্যক্তিকে স্থলাভিষিক্ত করে মামলা চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেয়।
  • ধারা ২৪৯: একবার এই ধারার অধীনে একটি কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেলে, বর্তমানে তা পুনরায় চালু (revive) করা যায় না, কারণ ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ৩৩৯ডি (যা পূর্বে পুনরুজ্জীবিত করার অনুমতি দিত) বাতিল করা হয়েছে। তবে, যেহেতু এটি খালাস নয়, তাই একই ঘটনায় একটি নতুন মামলা দায়ের করা বৈধ।

উপসংহার
ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ২৪৭ এবং ২৪৯ উভয়ই ম্যাজিস্ট্রেটকে ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতিতে মামলা নিষ্পত্তির ক্ষমতা দেয়। ধারা ২৪৭ অভিযোগ মামলায় প্রযোজ্য এবং এর ফলে আসামির খালাস হয়, যা একটি চূড়ান্ত নিষ্পত্তি। অন্যদিকে, ধারা ২৪৯ এফআইআর মামলায় প্রযোজ্য, এর ফলে কোনো চূড়ান্ত রায় হয় না, বরং আসামিকে সাময়িকভাবে মুক্তি দেওয়া হয় এবং একই ঘটনায় নতুন মামলা করার সম্ভাবনা থাকে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top