বিচারিক কার্যধারায় মিথ্যা বক্তব্য এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ ‘পারজুরি’ (Perjury) বিষয়ে আইনগত প্রতিকার
ভূমিকা
বিচারিক কার্যধারায় প্রায়ই দেখা যায়, একটি পক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের আবেদনপত্রে—বিশেষ করে রিট পিটিশনে—মিথ্যা তথ্য প্রদান করে আদালতের কাছ থেকে প্রতিকূল আদেশ গ্রহণের চেষ্টা করে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে প্রতিপক্ষ আইনগত প্রতিকারের অধিকারী। এ প্রেক্ষাপটে “পারজুরি” (Perjury) বা শপথভঙ্গজনিত অপরাধ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
পারজুরি কী?
পারজুরি হলো—আইনানুগভাবে শপথ নিয়ে বা ঘোষণাপত্রে ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা তথ্য প্রদান করা। এটি নিম্নোক্তভাবে সংঘটিত হতে পারে:
- আদালতে সাক্ষ্য দেয়ার সময় মিথ্যা কথা বলা
- হলফনামায় মিথ্যা তথ্য প্রদান
- কোনো আইনি নথিতে ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বিবরণ অন্তর্ভুক্ত করা
শর্ত হলো, এই মিথ্যা তথ্য মামলার ফলাফলে প্রভাব ফেলতে সক্ষম হতে হবে।
প্রাসঙ্গিক আইনসমূহ
✅ দণ্ডবিধি, ১৮৬০ (Penal Code, 1860)
- ধারা ১৯১:
শপথ নিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বলা বা জানা সত্ত্বেও অসত্য তথ্য প্রদান করলে তা মিথ্যা সাক্ষ্য হিসেবে গণ্য হয়। - ধারা ১৯৩:
বিচারিক কার্যধারায় মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদান বা মিথ্যা প্রমাণ তৈরি করলে ৭ বছরের কারাদণ্ড ও জরিমানা হতে পারে। বিচারিক কার্যধারার বাইরে হলে দণ্ড হবে ৩ বছর পর্যন্ত। - ধারা ২০৯:
আদালতে ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা দাবি করলে ২ বছরের কারাদণ্ড ও জরিমানা হতে পারে।
✅ ওথস অ্যাক্ট, ১৯৭৩ (Oaths Act, 1973)
- ধারা ৪ ও ৫:
আদালত বা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি সাক্ষ্যগ্রহণের সময় শপথ বা ঘোষণা গ্রহণ করাতে পারেন। - ধারা ১১ ও ১৪:
শপথের ভিত্তিতে প্রদত্ত সাক্ষ্য বা তথ্য সত্য হতে বাধ্য, এবং তা সাক্ষ্যদাতার বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
রিট মামলার প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের নিয়ম অনুযায়ী, রিট পিটিশনের সাথে অবশ্যই হলফনামা সংযুক্ত করতে হয়, যা নোটারি পাবলিক বা অ্যাফিডেভিট কমিশনার কর্তৃক স্বীকৃত হতে হয়। যদি এই পিটিশনে মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য-সংবলিত কোনো দলিল সংযুক্ত করা হয়, তবে তা মিথ্যা সাক্ষ্যের প্রত্যক্ষ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
আইনি প্রশ্ন ও বিশ্লেষণ
প্রশ্ন:
পেনাল কোডের ধারা ১৯৩ অনুযায়ী মিথ্যা সাক্ষ্য কি “সাক্ষ্য আইন” (Evidence Act, ১৮৭২) অনুসারে গ্রহণযোগ্য?
উত্তর:
না। কারণ পেনাল কোডের ধারা ১৯১ ও ১৯৩ নিজস্বভাবে পারজুরি অপরাধ এবং তার শাস্তি নির্ধারণ করে। সেক্ষেত্রে Evidence Act এর ধারা ৩ এখানে প্রাসঙ্গিক নয়।
এই ধরনের আচরণ ধারা ১৯১, ১৯৩ ও ২০৯ অনুযায়ী অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এই অবস্থায় CrPC-এর ধারা ১৯৫(বি) অনুসারে আদালতের অনুমতি ব্যতীত সরাসরি মামলা দায়ের করা যাবে না।
অন্যান্য প্রাসঙ্গিক আইন
✅ Contempt of Court Act, ১৯২৬ ও ২০০৩
আদালতের প্রতি ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন করে বিচারকে বিভ্রান্ত করা হলে, তা আদালত অবমাননা হিসেবে বিবেচিত হবে। এজন্য আদালত জরিমানা বা কারাদণ্ড প্রদান করতে পারে।
✅ ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ (Criminal Procedure Code, 1898)
- ধারা ৩৪০:
আদালত যদি মনে করে যে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন, তবে নিজ উদ্যোগে তদন্ত ও বিচারিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে।
ভুক্তভোগীর করণীয় (আইনি প্রতিকার)
প্রতারণামূলকভাবে আদেশ গ্রহণকারী বা মিথ্যা তথ্য প্রদানকারীর বিরুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ নিম্নলিখিত প্রতিকার পেতে পারেন:
- ✅ ফৌজদারি মামলা দায়ের:
দণ্ডবিধি ও CrPC অনুযায়ী প্রতারণা, মিথ্যা সাক্ষ্য ও জালিয়াতির অভিযোগ আনা যেতে পারে। - ✅ দেওয়ানি প্রতিকার:
ক্ষতিপূরণ দাবি, আদালতের পূর্বের আদেশ বাতিল/বাতিলের আবেদন করা যেতে পারে। - ✅ আদেশ পুনর্বিবেচনার আবেদন (Review/Recall):
মিথ্যার মাধ্যমে আদেশ পাওয়া হলে তা পুনর্বিবেচনার জন্য আদালতে আবেদন করা যায়।
উপসংহার
বিচারিক কার্যধারায় মিথ্যা তথ্য প্রদান, জাল দলিল সংযুক্তি এবং প্রতারণামূলক দাবি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ।