নমিনি সংক্রান্ত যাবতীয় প্রশ্ন ও উত্তর।

নমিনির সংজ্ঞা ও আইনগত মর্যাদা

প্রশ্ন ১: নমিনি কে?

উত্তর: মৃত্যুর পর ব্যাংক, সঞ্চয়পত্র বা বীমা থেকে অর্থ উত্তোলনের জন্য মনোনীত ব্যক্তিই হলেন নমিনি।

প্রশ্ন ২: নমিনি কি সম্পত্তির মালিক হন?

উত্তর: না। নমিনি মালিক নন, তিনি শুধু একজন ট্রাস্টি বা আমানতদার। টাকা তুলতে পারবেন, কিন্তু ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টন করতে বাধ্য।

প্রশ্ন ৩: নমিনি মনোনয়নের উদ্দেশ্য কী?

উত্তর: মৃত্যুর পর জটিলতা ছাড়া আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে সহজে ও দ্রুত অর্থ উত্তোলনের সুবিধার জন্য নমিনি মনোনীত করা হয়।

প্রশ্ন ৪: “আমি ১০০% নমিনি, পুরো টাকা আমার” — এই দাবি কি বৈধ?

উত্তর: না। ১০০% নমিনি মানে ১০০% টাকা উত্তোলনের অনুমতি, মালিকানা নয়। শরিয়া মোতাবেক তা বণ্টন করতেই হবে।

প্রশ্ন ৫: উত্তরাধিকারীরা কি নমিনি হতে পারেন?

উত্তর: হ্যাঁ পারেন এবং এটাই সবচেয়ে ভালো। তখন তিনি নমিনি হিসেবে টাকা তুলবেন এবং ওয়ারিশ হিসেবে নিজের শরিয়া-নির্ধারিত অংশ রেখে বাকিটা অন্যদের দেবেন।

প্রশ্ন ৬: নমিনি ও ওয়ারিশের মধ্যে বিরোধ হলে আইনি লড়াইয়ে কে জিতবেন?

উত্তর: বিষয়টি এখনো বিজ্ঞ আপিল বিভাগে বিচারাধীন। তবে বিজ্ঞ হাইকোর্টের সর্বশেষ রায় অনুযায়ী, উত্তরাধিকারীরা আদালতে তাদের প্রাপ্য দাবি করতে পারবেন এবং তারাই প্রকৃত দাবিদার।

প্রশ্ন ৭: মুসলিম উত্তরাধিকার আইন ও নমিনি আইনের মধ্যে কোনটি প্রাধান্য পাবে?

উত্তর: ব্যাংক আইনে টাকা তোলার ক্ষেত্রে নমিনি এগিয়ে, কিন্তু শরিয়া আইনে ওয়ারিশরা মূল মালিক ও দাবিদার। দুটি আইনের সংঘাতের চূড়ান্ত সমাধান এখনো বিজ্ঞ আপিল বিভাগে বিচারাধীন।

প্রশ্ন ৮: নমিনির মাধ্যমে কি উত্তরাধিকার আইন পাশ কাটানো যায়?

উত্তর: না। শুধুমাত্র নমিনি করে কোনো ওয়ারিশকে বঞ্চিত করা ইসলামি আইনের পরিপন্থী এবং বিজ্ঞ আদালতে চ্যালেঞ্জযোগ্য।

প্রশ্ন ৯: নমিনি নিজেই ওয়ারিশ হলে কি সবার মধ্যে শরিয়া অনুযায়ী বণ্টন হবে?

উত্তর: হ্যাঁ। নমিনি তার নিজের শরিয়া-নির্ধারিত অংশ রাখবেন এবং বাকি অংশ অন্য ওয়ারিশদের দিতে আইনগতভাবে বাধ্য।

প্রশ্ন ১০: ছেলে নমিনি হলে মেয়ে ও স্ত্রী কীভাবে টাকা পাবেন?

উত্তর: ছেলে পুরো টাকা তুলবেন। তারপর শরিয়া অনুযায়ী বণ্টন করবেন — স্ত্রী পাবেন \frac{১}{৮} অংশ, বাকি অংশ ছেলে দ্বিগুণ ও মেয়ে একগুণ হারে পাবেন।

প্রশ্ন ১১: অন্য ওয়ারিশরা নমিনির সাথে টাকা দাবি করলে কী হবে?

উত্তর: বিজ্ঞ হাইকোর্টের রায় অনুযায়ী নমিনি কেবল টাকা উত্তোলনের মাধ্যম। ওয়ারিশরা দাবি করলে শরিয়া আইন অনুযায়ী বণ্টন করতেই হবে।

প্রশ্ন ১২: সব ওয়ারিশ রাজি হলে নমিনি কি পুরো টাকা রাখতে পারবেন?

উত্তর: হ্যাঁ। সব প্রাপ্তবয়স্ক ওয়ারিশ যদি স্বেচ্ছায় ও লিখিতভাবে তাদের অংশ ছেড়ে দেন, তবে সেটা হেবা (উপহার) হিসেবে সম্পূর্ণ বৈধ।

প্রশ্ন ১৩: নমিনি ও উইলের মধ্যে পার্থক্য কী?

উত্তর: নমিনি শুধু টাকা তোলার অনুমতি দেয়, মালিকানা দেয় না। উইলে যাকে দেওয়া হয় তিনি মালিক হন। ইসলামে কোনো ওয়ারিশকে বঞ্চিত না করে সর্বোচ্চ \frac{১}{৩} সম্পদ উইল করা যায়।

প্রশ্ন ১৪: ব্যাংক আইনে নমিনির অধিকার কী?

উত্তর: ব্যাংক কোম্পানি আইন ১৯৯১-এর ধারা ১০৩(৩) অনুযায়ী নমিনি অগ্রাধিকার পান। তবে বিজ্ঞ হাইকোর্টের রায় অনুযায়ী নমিনি কেবল ট্রাস্টি — ওয়ারিশদের বণ্টন করতে বাধ্য।

প্রশ্ন ১৫: ব্যাংক হিসাবে কতজন নমিনি করা যায়?

উত্তর: একজন বা একাধিক। একাধিক হলে প্রত্যেকের শতাংশ (%) ভাগ ফরমে উল্লেখ করতে হবে।

প্রশ্ন ১৬: সঞ্চয়পত্রে নমিনির আইনগত অবস্থান কী?

উত্তর: সঞ্চয়পত্রের নমিনিও মালিক নন, ট্রাস্টি। নমিনি টাকা পেলেও তা মৃত ব্যক্তির সম্পদ হিসেবেই থাকে এবং ওয়ারিশদের মধ্যে শরিয়া অনুযায়ী বণ্টিত হবে।

প্রশ্ন ১৭: জীবন বীমায় নমিনির ভূমিকা কী?

উত্তর: বীমা কোম্পানি থেকে অর্থ গ্রহণের অনুমোদিত ব্যক্তি মাত্র, তবে তিনি মালিক নন। উত্তরাধিকারীরা তাদের প্রাপ্য অংশ বিজ্ঞ আদালতে দাবি করতে পারবেন।

প্রশ্ন ১৮: বীমার নমিনি কি ইসলামি আইনের সাথে সাংঘর্ষিক?

উত্তর: হ্যাঁ, যদি নমিনি পুরো টাকা নিজে মালিক হিসেবে রেখে দেন। ইসলামি আইনে নমিনিত্ব উইল বা উপহারের সমতুল্য নয়, তাই উত্তরাধিকারীদের অধিকার বাতিল হয়না।

প্রশ্ন ১৯: অপ্রাপ্তবয়স্ককে নমিনি করা যায় কি?

উত্তর: হ্যাঁ। তবে একজন অভিভাবকের নাম দিতে হবে, যিনি নমিনি সাবালক হওয়া পর্যন্ত অর্থ পরিচালনা করবেন।

প্রশ্ন ২০: জমি বা ফ্ল্যাটে কি নমিনি করা যায়?

উত্তর: না। স্থাবর সম্পত্তির উত্তরাধিকার সম্পূর্ণ মুসলিম বা প্রযোজ্য উত্তরাধিকার আইনে নির্ধারিত হয়। মৃত্যুর পর নামজারির জন্য উত্তরাধিকার সনদ লাগবে।

প্রশ্ন ২১: জীবদ্দশায় নমিনি পরিবর্তন করা যায় কি?

উত্তর: হ্যাঁ, মূল মালিক জীবিত থাকা অবস্থায় যেকোনো সময় নির্ধারিত ফরম পূরণ করে নমিনি পরিবর্তন, সংযোজন বা বাতিল করতে পারেন।

প্রশ্ন ২২: সঞ্চয়পত্রের নমিনি যদি মালিকের আগেই মারা যান তাহলে কী হবে?

উত্তর: নমিনিত্ব স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে। নতুন নমিনি না করলে উত্তরাধিকার আইন প্রযোজ্য হবে এবং বিজ্ঞ আদালত থেকে উত্তরাধিকার সনদ নিতে হবে।

প্রশ্ন ২৩: সঞ্চয়পত্রে একাধিক নমিনির একজন মারা গেলে কী হবে?

উত্তর: জীবিত নমিনি তাঁর নির্ধারিত অংশ পাবেন। মৃত নমিনির অংশ উত্তরাধিকার সনদ অনুযায়ী ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টিত হবে।

প্রশ্ন ২৪: নমিনি থাকলে ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে কী কী লাগে?

উত্তর: মৃত্যু সনদ, নমিনির জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) এবং আবেদনপত্র। কিছু ব্যাংক ওয়ারিশান সনদও চাইতে পারে।

প্রশ্ন ২৫: নমিনি না থাকলে মৃত ব্যক্তির টাকা কে পাবেন?

উত্তর: বিজ্ঞ আদালত থেকে উত্তরাধিকার সনদ (Succession Certificate) নিয়ে আইনগত ওয়ারিশরা পাবেন।

প্রশ্ন ২৬: নমিনি না থাকলে টাকা তুলতে কী কী লাগে?

উত্তর: বিজ্ঞ জেলা জজ আদালত থেকে উত্তরাধিকার সনদ, মৃত্যু সনদ, ওয়ারিশান সনদ এবং সকল ওয়ারিশের জাতীয় পরিচয়পত্র।

প্রশ্ন ২৭: নমিনি টাকা তুলে ওয়ারিশদের না দিলে কী হবে?

উত্তর: ওয়ারিশরা দেওয়ানি আদালতে মামলা করে প্রাপ্য আদায় করতে পারবেন। নমিনি বিশ্বাসভঙ্গ ও আত্মসাতের দায়ে পড়তে পারেন।

প্রশ্ন ২৮: নমিনির বিরুদ্ধে কোন কোন আইনে মামলা হবে?

উত্তর: দেওয়ানিতে উত্তরাধিকার আইন, ১৯২৫। ফৌজদারিতে দণ্ডবিধির ধারা ৪০৬ (কারাদণ্ডযোগ্য বিশ্বাসভঙ্গ) ও ধারা ৪২০ (প্রতারণা)।

প্রশ্ন ২৯: নমিনি টাকা তোলার আগেই কি তা থামানো যাবে?

উত্তর: হ্যাঁ। বিজ্ঞ আদালত থেকে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা (Temporary Injunction) নিয়ে ব্যাংককে টাকা প্রদান বন্ধ রাখতে বলা যাবে, তবে তা টাকা তোলার আগেই করতে হবে।

প্রশ্ন ৩০: উত্তরাধিকার সনদ কীভাবে পাবেন?

উত্তর: বিজ্ঞ জেলা জজ আদালতে আবেদন করতে হবে। মৃত্যু সনদ, ওয়ারিশান সনদ দাখিল ও পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার পর কোনো আপত্তি না এলে বিজ্ঞ আদালত সনদ দেবেন।

প্রশ্ন ৩১: মামলা ছাড়া কি টাকা আদায় সম্ভব?

উত্তর: হ্যাঁ। পারিবারিক আলোচনা, স্থানীয় সালিশ, বিচার সালিশ কেন্দ্র বা সরকারি লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে সমাধান করা যায়। মামলা সর্বশেষ পদক্ষেপ।

প্রশ্ন ৩২: নমিনি বিষয়ে হাইকোর্টের ঐতিহাসিক রায় কোনটি?

উত্তর: ৩ এপ্রিল ২০১৬, সিভিল রিভিশন নং ১৬৮২/২০১৫ — মোঞ্জুরুল হক বনাম বিলকিস আরা বেগম মামলা। দ্বিতীয় স্ত্রী ১০০% নমিনি হিসেবে ৩০ লাখ টাকা একা দাবি করলে বিজ্ঞ হাইকোর্ট রায় দেন — “নমিনি ট্রাস্টি, মালিক নন। ওয়ারিশরাই প্রকৃত দাবিদার।”

প্রশ্ন ৩৩: বিজ্ঞ আপিল বিভাগ কি হাইকোর্টের রায় বহাল রেখেছেন?

উত্তর: না, বিজ্ঞ আপিল বিভাগ রায়টি স্থগিত করেন। এরপর বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১৭ সালে DFIM সার্কুলার নং ২ জারি করে নমিনিকে টাকা উত্তোলনে আবার অগ্রাধিকার দেয় (তবে তা কেবল উত্তোলনের ক্ষেত্রে, মালিকানায় নয়)।

প্রশ্ন ৩৪: ২০১৯ সালে বিজ্ঞ হাইকোর্ট পূর্ণাঙ্গ রায়ে কী বললেন?

উত্তর: বিজ্ঞ হাইকোর্ট পূর্ণাঙ্গ রায়ে পুনর্ব্যক্ত করলেন — নমিনি টাকা তুলবেন ঠিকই, কিন্তু শরিয়া আইন অনুযায়ী তা ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টন করতে হবে।

প্রশ্ন ৩৫: নমিনির পক্ষে কোনো লিখিত অঙ্গীকারনামা কি আইনগতভাবে বৈধ বা কার্যকর?

উত্তর: না, এই অঙ্গীকারনামা আইনগতভাবে বাতিলযোগ্য।

প্রশ্ন ৩৬: এই অঙ্গীকারনামা কেন কার্যকর নয়?

উত্তর: কারণ মুসলিম পার্সোনাল ল (শরিয়ত) অ্যাপ্লিকেশন অ্যাক্ট, ১৯৩৭ অনুযায়ী মুসলিম ব্যক্তির মৃত্যুর পর সম্পদ বণ্টনে শরিয়ত আইনই বাধ্যতামূলক।

প্রশ্ন ৩৭: অঙ্গীকারনামা কি উইল হিসেবে গণ্য হতে পারে?

উত্তর: অঙ্গীকারনামা উইল হিসেবে গণ্য হলেও ইসলামি আইনে অন্য ওয়ারিশদের সম্মতি ছাড়া কোনো নির্দিষ্ট ওয়ারিশকে সব সম্পত্তি দেওয়া যায় না এবং তা সর্বোচ্চ \frac{১}{৩} সম্পদের ওপর কার্যকর হতে পারে। বাকি \frac{২}{৩} সম্পদ শরিয়া অনুযায়ী সকল ওয়ারিশের মধ্যে বণ্টিত হবেই।

প্রশ্ন ৩৮: নমিনিত্ব কি ওয়ারিশদের অধিকার বাতিল করতে পারে?

উত্তর: না, নমিনিত্ব কখনোই ওয়ারিশদের আইনগত বা ধর্মীয় অধিকার বাতিল করতে পারে না।

এডভোকেট মুহাম্মদ মহিউদ্দীন খান।

follow our Page https://www.facebook.com/share/18TKedRvMV/

Subscribe our Channel https://www.youtube.com/@lawwithadvocatemahiuddinkhan

Scroll to Top